ভারত ও চীনের মধ্যে পূর্ব লাদাখে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) বরাবর যে সংঘাত চলছে, তার একটি নিরসনের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে দুই দেশের সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে এখনও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
রবিবার মুম্বাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এস জয়শঙ্কর এই বিষয়ে বিশদে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “ডেপসাং ও ডেমচোক এলাকায় সেনা বিচ্ছিন্নকরণ শুরু হয়েছে, যা এলএসি বরাবর চলমান উত্তেজনা হ্রাসের প্রথম পদক্ষেপ। তবে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে সময় লাগবে।”
সেনা বিচ্ছিন্নকরণ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
জয়শঙ্কর আরও জানান যে, এই বিচ্ছিন্নতার পরবর্তী ধাপ হবে ডি-এস্কালেশন বা উত্তেজনা কমানো। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ডি-এস্কালেশন শুরু হবে তখনই, যখন ভারত নিশ্চিত হবে যে চীনও একই ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চীন যদি আমাদের মতো একইভাবে কাজ করে, তাহলে আমরা এগিয়ে যাব। তবে কোনো তাড়াহুড়ো হবে না।”
পিটিআই-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, এই মাসের শুরুতে ভারত ও চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছেছিল, যেখানে দুই দেশ ডেপসাং ও ডেমচোক এলাকায় সেনা টহল ও বিচ্ছিন্নকরণের বিষয়ে একমত হয়েছিল। এই চুক্তি পূর্ব লাদাখে ২০২০ সাল থেকে চলমান চার বছরের অচলাবস্থা শেষ করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২০-এর অবস্থা পুনঃস্থাপনের আশা
পরিস্থিতি সম্পর্কে জয়শঙ্কর আরও বলেন, “আমরা আশা করি যে ২০২০ সালে লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের যে অবস্থা ছিল, তা পুনঃস্থাপন করা হবে। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে। এটি একটি বিচ্ছিন্নতা ও টহল দেওয়ার বিষয়, যেখানে আমাদের সেনাবাহিনী খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিল এবং এখন তারা তাদের ঘাঁটিতে ফিরে গেছে। আমরা চাই ২০২০-এর অবস্থায় ফিরে যাওয়া হোক।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই বিচ্ছিন্নতার ফলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ সমাধান পেতে আরও সময়ের প্রয়োজন হবে।
চুক্তির বিবরণ ও পটভূমি
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে গলওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর থেকে পূর্ব লাদাখে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। সেই সংঘর্ষে উভয়পক্ষের বহু সেনা হতাহত হয়। এর পর থেকে দুই দেশ একাধিক পর্যায়ের আলোচনায় বসেছে এবং সীমান্তে সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে উভয় দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়, যেখানে দুই দেশ ডেপসাং ও ডেমচোক এলাকায় সেনা বিচ্ছিন্নকরণের বিষয়ে একমত হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, দুই দেশের সেনাবাহিনী এলএসি বরাবর থেকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাবে এবং এলাকায় টহল বন্ধ রাখা হবে, যাতে কোনো ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
এটি ছিল এক দীর্ঘ আলোচনার ফল, যা গত কয়েক মাস ধরে চলে আসছিল। এই আলোচনায় মূলত উভয়পক্ষের সেনাবাহিনী একে অপরের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে এবং সীমান্ত সংঘাত নিরসনে একটি প্রক্রিয়া তৈরি করার চেষ্টা করে।
চীনের প্রতিক্রিয়া
এদিকে, চীনের পক্ষ থেকেও একই ধরনের মন্তব্য এসেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, চীনও চুক্তি অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে পিছু হটাচ্ছে এবং সীমান্তে শান্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তবে চীনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, সীমান্ত সংঘাত সমাধান করতে হলে উভয় পক্ষের সহনশীলতা ও ধৈর্যের প্রয়োজন।
চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, “আমরা আশা করি যে, দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে সীমান্ত সংঘাত নিরসনে অগ্রসর হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে।”
এছাড়াও, পড়ুন : গ্লোবাল প্লাস্টিক চিপ কার্ডের বাজারের আকার 2023 সালে USD 2.40 বিলিয়ন ছিল, এই প্রতিবেদনটি বাজারের বৃদ্ধি, প্রবণতা, সুযোগ এবং পূর্বাভাস 2024-2030 কভার করে
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যত প্রক্রিয়া
যদিও সেনা বিচ্ছিন্নকরণের চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে, এটি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এর কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন যে, দুই দেশের মধ্যে এখনও গভীর মতবিরোধ রয়েছে এবং এলএসি বরাবর আরও কিছু বিতর্কিত এলাকা রয়েছে, যেখানে দুই দেশের সেনাবাহিনী মুখোমুখি অবস্থান করছে।
উল্লেখ্য, লাদাখের এলএসি বরাবর সংঘাতের মূল কারণ হলো সীমান্তের অব্যবস্থাপনা ও অস্পষ্ট সীমারেখা, যা নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতবিরোধ রয়েছে। যদিও উভয় দেশই ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকে সীমান্ত সমস্যা সমাধানে একাধিক চুক্তি করেছে, তবুও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর সংঘাতের ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে।
অতীত সংঘাত ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২০ সালের গলওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে এবং উভয় দেশই সীমান্তে সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনা বিচ্ছিন্নকরণ ও টহল স্থগিত করার এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে তারা সতর্ক করছেন যে, এলএসি বরাবর পুরোপুরি শান্তি স্থাপন করতে হলে আরও অনেক আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন হবে।
এদিকে, ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সীমান্তে যে কোনো ধরনের অস্থিরতা রোধে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উপসংহার
এস জয়শঙ্করের এই বক্তব্য এলএসি বরাবর ভারত ও চীনের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। যদিও সেনা বিচ্ছিন্নকরণ শুরু হয়েছে, তবে সম্পূর্ণ শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে সময় লাগবে।